গত এক দশক বৈশ্বিক ঋণ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে, এর বিপরীতে বৈশ্বিক জিডিপি বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বের অর্থনীতিগুলোর উৎপাদন ও আয়ের তুলনায় ঋণের পরিমাণ দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে সরকারি ব্যয় কার্যক্রমের বিস্তৃতি। বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারীর সময় বেশির ভাগ দেশই অর্থনীতি সচল রাখতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণোদনা দিয়েছে। এছাড়া ব্যবসায় বিনিয়োগ ও ভোগচাহিদা বাড়ায় করপোরেট ও পারিবারিক পর্যায়ে ঋণ সম্প্রসারণ হয়েছে।
বৈশ্বিক ঋণ সম্প্রসারণের এ চিত্র তুলে ধরেছে ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (আইআইএফ)। সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, ২০১৫ সালের শেষ দিকে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২১৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৩১৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক দশকে ঋণ বেড়েছে ১০৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফে) তথ্যানুসারে, গত ১০ বছরে বিশ্বব্যাপী জিডিপি প্রায় ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ১১০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, বর্তমানে জিডিপির তিনগুণ ছাড়িয়ে গেছে বৈশ্বিক ঋণ।
উল্লিখিত ১০ বছর সময়কালে পারিবারিক ঋণ ৫০ শতাংশ বেড়ে ৬০ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে আর্থিক খাত-বহির্ভূত সংস্থাগুলোর ঋণ ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৯১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে কম, ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গ এসেছে বিভিন্ন ফোরামে। আইআইএফের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক ঋণে বাড়বাড়ন্ত পরিস্থিতিতে সামনের দিকেই রয়েছে সরকারের ভূমিকা। ২০১৫ সালের শেষ দিকে বৈশ্বিক সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৬ দশমিক ট্রিলিয়ন ডলার, যা এক দশক পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের শেষ দিকে ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৯৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বৈশ্বিক মোট ঋণের হিস্যায় উন্নত বাজারগুলো এগিয়ে থাকলেও বৃদ্ধির হারে তাদের পেছনে ফেলে দিয়েছে উদীয়মান বাজার। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত এক দশকে উন্নত বাজারে ঋণ ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২১৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে উদীয়মান বাজারে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ১০৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে উন্নত অর্থনীতিগুলো। এ সময় উন্নত অর্থনীতি ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল বাজারে এ হার ছিল ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত এক দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে ছিল কভিড-১৯ মহামারীসংক্রান্ত পদক্ষেপ। ওই সময় অর্থনীতির ওপর মহামারীর কঠোর প্রভাব পড়ে, যা কমিয়ে আনতে বড় অংকের প্রণোদনা বেছে নেয় সরকারগুলো, যা বৈশ্বিক ঋণ বাড়লেও সংকুচিত হয়েছিল জিডিপি প্রবৃদ্ধি।
আইএমএফের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ২ দশমিক ৫ সংকুচিত হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে বৈশ্বিক ঋণ ১৩ শতাংশ বেড়ে ২৯১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কভিডকে মহামারী ঘোষণা দেয়। আইআইএফের তথ্যানুসারে, ওই সময় বৈশ্বিক ঋণ ছিল ২৫৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে গত বছরের শেষ নাগাদ ৩১৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। অন্যদিকে আইএমএফের পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, একই সময়ে বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে।
এছাড়া গত এক দশকে বৈশ্বিক বাণিজ্য দ্বিগুণ বেড়ে প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ঋণ ধারণের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের শেষে দেশটির ঋণ ছিল ৯৭ দশমিক ৮৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা গত এক দশকে বেড়েছে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ বৈশ্বিক ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে। এর বিপরীতে জিডিপি বেড়েছে ঋণের তুলনায় কম, ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
ইউরো অঞ্চলের ঋণ ২২ দশমিক বেড়ে ৫৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে এখানকার অর্থনীতি ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে, যা ঋণের বৃদ্ধির তুলনায় বেশি। প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ঋণ গত দশকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। রাশিয়ার ঋণ ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যখন অর্থনীতি বেড়েছে ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ।
ঋণ ও জিডিপির ভারসাম্য অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন। দেশটিতে এক দশকে ঋণ ১২৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৬২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ সময় জিডিপি বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ ঋণের বৃদ্ধির হারের প্রায় অর্ধেক।